• বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ০১:০৮ অপরাহ্ন
Headline
অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটে জিম্মি রোগীরা রংপুরে দমদমা সেতুর সামনে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা সরকার ও বিরুধী দলীয় এমপি সবার নির্বাচনী এলাকায় সমান উন্নয়ন হবে :প্রধানমন্ত্রী চাল-ডাল থেকে ক্যামেরা, ৬০ পণ্যের দাম কমানোর পরিকল্পনা বাজেটে জামালপুর সদর থানার ওসির নেতৃত্বে ম্যারাথন অভিযান: লক্ষীরচর হত্যা মামলার প্রধান আসামি গ্রেফতার- মানবতার সেবায় দৃষ্টান্ত: অসহায় বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা ২০২৮ সালের মধ্যে সবাইকে ই-হেলথ কার্ডের আওতায় আনা হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন (বকুল) এক গ্রামে ৩৭ ‘জিনের বাদশা’, হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা সাংবাদিকের সঙ্গে প্রেম করার ১১ সুবিধা সৈয়দপুরে দেশীয় পাখি বিক্রির দায়ে জরিমানা

অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটে জিম্মি রোগীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক রাজশাহী / ২৪ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দা পারভীন বেগম। হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি গত ১৪ মে রাত আড়াইটার দিকে মারা যান। ওই রাতে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করতে যান স্বজনরা। কিন্তু মাত্র ৫০ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিতে ভাড়া চাওয়া হয় ৩০ হাজার টাকা। পরে ভাড়া মিটিয়ে সাড়ে ৯ হাজার টাকায় নিয়ে যাওয়া হয় মরদেহ।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী, ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ৩৫ টাকা এবং ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের জন্য প্রতি কিলোমিটার ৩০ টাকা নির্ধারিত। কিন্তু কোনো চালকই এই নিয়ম মানছে না। শুধু তাই নয়, বাইরে থেকে কোনো অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালের ভেতরে ঢুকতেও দেওয়া হয় না। কেউ যদি বাধ্য হয়ে বাইরের কোনো কম ভাড়ার অ্যাম্বুলেন্স আনতে যান, তবে সিন্ডিকেটের হাতে লাঞ্ছিত হতে হয়, এমনকি মারধরের শিকারও হতে হয়।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অ্যাম্বুলেন্সের বিশাল সিন্ডিকেট আছে এখানে। হাসপাতাল থেকে কোনো মৃতদেহ বা ছাড়পত্র পাওয়া রোগী বের হলে মৌমাছির ঝাঁকের মতো ঘিরে ধরে সিন্ডিকেটের সদস্যরা। তারা একবার যেই ভাড়া বলবে সেই ভাড়াতেই যেতে হবে। অন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্সও নিয়ে যাবে না। এই সিন্ডিকেট বেশ শক্তিশালী। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে চলে তারা।

এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা এতটাই প্রভাবশালী যে তাদের ভয়ে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. হাসানুল হাসিব কথা বলতে রাজি হননি। তিনি জানান, অ্যাম্বুলেন্সচালকরা অনেকেই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালায়। তাদের গাড়িতে চলাচল করা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ।

রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির বলেন, হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের বিষয়টি সমাধানের জন্য ইতিমধ্যেই ট্রাফিক বিভাগকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অচিরেই এই সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রামেক হাসপাতালে ৮ থেকে ১০ জনের একটি চক্র পুরো অ্যাম্বুলেন্স খাত নিয়ন্ত্রণ করছে। চক্রটি এতটাই প্রভাবশালী যে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেশি ভাড়া আদায় করছে তারা। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে কয়েকজনের নাম এসেছে। তারা হলো- সুমন, ডালিম, বাদশা, সাদ্দাম, বিপ্লব ও নিপুসহ আরও অনেকে। এর মধ্যে সুমনের একারই রয়েছে ১১টি এবং বিপ্লব ও নিপুর রয়েছে ৪টি অ্যাম্বুলেন্স। এ ছাড়া সবার কয়েকটি করে অ্যাম্বুলেন্স আছে। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে পরিচিত সুমন ও ডালিম। তাদের দাবি, তারা কোনো সিন্ডিকেট পরিচালনা করে না। হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।

মাথায় গাছের ডাল ভেঙে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছিলেন মালেকা বেগম। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তির পর টানা ১৪ দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে তিনি মারা যান। তার বাড়ি পাবনার সুজানগর উপজেলার কালিকাপুর গ্রামে। হাসপাতাল থেকে শেষ যাত্রা, বোনকে নিয়ে ফিরতে হবে বাড়ি। তাই মর্গের সামনে অ্যাম্বুলেন্সের অপেক্ষায় বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন বোন রাজিয়া খাতুন। কান্নায় ভেঙে পড়ার কারণ অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়া। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মালেকা বেগমের বোন বলেন, আইসিউতে থাকা অবস্থায় অনেক টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু বাড়ি নিয়ে যাব সেই অ্যাম্বুলেন্সচালক অনেক টাকা চাচ্ছে। আমার কাছে এত টাকা নেই। আকুতি-মিনতি করেও লাভ হচ্ছে না। ৩০ হাজার টাকার নিচে কোনো অ্যাম্বুলেন্স যেতে চাচ্ছে না।

১ হাজার ২০০ শয্যার এই সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন রোগী মারা যান। গত ১৫ দিনেই এখানে মারা গেছেন ৪৯০ জন। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ মানুষ বাড়ি ফিরলেও মৃতদেহ কিংবা গুরুতর অসুস্থ রোগীদের বাড়ি ফেরার একমাত্র ভরসা অ্যাম্বুলেন্স। আর এই অ্যাম্বুলেন্স ঘিরেই গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী ও বেপরোয়া সিন্ডিকেট।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালে কেউ মারা গেলেই দালাল ও ওয়ার্ড বয়দের মাধ্যমে দ্রুত খবর চলে যায় সিন্ডিকেটের হোতাদের কাছে। এরপরই স্বজনদের বাধ্য করা হয় তাদের সিন্ডিকেটের অ্যাম্বুলেন্স নিতে। অর্ধশত অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়ার একটি বড় অংশ কমিশন হিসেবে চলে যায় চক্রটির পকেটে। পাশাপাশি রয়েছে ময়নাতদন্তের নামে চাঁদাবাজি। সরকারি হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পূর্ণ ফ্রি হলেও প্রতিটি মরদেহের জন্য ডোমকে দিতে হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা।

এছাড়া ট্রলিম্যানরা রোগীকে ওয়ার্ডে নেওয়া বা অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেওয়ার জন্যও স্বজনদের কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায় করে। এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশ মানুষই নিম্নমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র হওয়ায় এমন লাগামহীন খরচে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category