এস এম নজরুল ইসলাম মফস্বল সম্পাদক বরিশাল
বরিশালের গৌরনদীতে দুই সাংবাদিককে ঘিরে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সাংবাদিক মহল, সামাজিক সংগঠন, রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হওয়ায় নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
সম্প্রতি গৌরনদী প্রেসক্লাবে দাখিল করা এক লিখিত অভিযোগে শিরিন আক্তার নামে এক নারী গৌরনদী সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক ইনকিলাবের গৌরনদী প্রতিনিধি মোঃ মেহেদী হাসান ও গৌরনদী প্রেসক্লাবের সদস্য মোঃ নাসির উদ্দীনের বিরুদ্ধে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক আচরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং পেশাগত নীতিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ করেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, পারিবারিক জমিজমা-সংক্রান্ত একটি বিরোধের ঘটনায় কয়েকজন ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযোগকারী ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার ও ভয়ভীতি সৃষ্টির অভিযোগ উত্থাপন করা হয়।
এদিকে অভিযোগ প্রকাশের পর কোনো ধরনের তদন্ত বা যাচাই-বাছাই ছাড়াই অনলাইন নিউজ পোর্টাল “দৈনিক ভোরের নিউজ”-এ “গৌরনদীতে সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি ও অনৈতিক আচরণ এবং ভয়ভীতির অভিযোগ” শীর্ষক এবং “দৈনিক আজকের প্রতিদিন”-এ “গৌরনদীতে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক আচরণ ও ভয়ভীতির অভিযোগ” শীর্ষক সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ ধরনের একতরফা ও যাচাই-বিহীন সংবাদ প্রকাশের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন সাংবাদিক মোঃ মেহেদী হাসান এবং সাংবাদিক মোঃ নাসির উদ্দীন।
এক প্রতিবাদলিপিতে তারা বলেন, তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তারা দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট ঘটনায় তারা সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সরেজমিনে গিয়েছিলেন এবং একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিক হিসেবে ঘটনার বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য ও তথ্য সংগ্রহ করছিলেন।
প্রতিবাদলিপিতে মেহেদী হাসান বলেন, অনলাইন নিউজ পোর্টাল “দৈনিক ভোরের নিউজ” ও “আজকের প্রতিদিন”-এ প্রকাশিত সংবাদে তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, সেগুলোর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তিনি অভিযোগ করেন, কোনো ধরনের নিরপেক্ষ যাচাই-বাছাই ছাড়াই একতরফাভাবে অভিযোগভিত্তিক সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগকারী পক্ষের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও অভিযুক্তদের বক্তব্য যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি এবং অভিযোগের পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণও উপস্থাপন করা হয়নি।
মেহেদী হাসান আরও দাবি করেন, প্রতিবেদনে টরকী বন্দর, ধানডোবা ও একটি ফার্মেসি সংক্রান্ত যেসব ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো “দৈনিক ভোরের নিউজ”-এর প্রতিবেদকের মনগড়া সংযোজন এবং এসব অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। তিনি বলেন, “এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ প্রকাশের আগে তথ্য-প্রমাণ ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এখানে তা করা হয়নি।”
প্রতিবাদলিপিতে আরও বলা হয়, প্রতিবেদনে সাংবাদিক রাশেদ আহম্মেদের বরাত দিয়ে মেহেদী হাসানের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে যেসব মন্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত অশালীন, আপত্তিকর ও মানহানিকর। এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান মেহেদী হাসান।
এ বিষয় গৌরনদী সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, “কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা যেতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক বিষয় বা চরিত্র নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা সাংবাদিকতার নীতিমালার পরিপন্থী। একজন সাংবাদিক সম্পর্কে এ ধরনের ভাষা ব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
একই সঙ্গে প্রতিবেদনে তার শৈশব, শিক্ষাজীবন ও পূর্ববর্তী পেশা নিয়ে যেসব মন্তব্য করা হয়েছে, সেগুলোকেও তিনি বিদ্বেষমূলক বলে মনে করেন। তার ভাষ্য, একজন মানুষ এতিম হিসেবে বেড়ে উঠেছেন কি না, কোথায় পড়াশোনা করেছেন বা পূর্বে কোন পেশায় যুক্ত ছিলেন—এসব বিষয়কে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
অন্যদিকে সাংবাদিক মোঃ নাসির উদ্দীন তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত বক্তব্যেরও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, প্রতিবেদনে তার ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক অবস্থা ও বেড়ে ওঠা নিয়ে যেভাবে মন্তব্য করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই সাংবাদিকসুলভ আচরণের মধ্যে পড়ে না।
আমার পারিবারিক পটভূমি, কোথা থেকে এসেছি বা কীভাবে বড় হয়েছি—এসব বিষয়কে ব্যবহার করে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এ বিষয় উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব শরীফ জহির সাজ্জাদ হান্নান বলেন, একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ করা যেতে পারে। কিন্তু তাকে ‘প্রতারক’, ‘অপসাংবাদিক’ বা অন্যান্য অবমাননাকর অভিধায় আখ্যায়িত করা এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কুৎসা রটানো গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রতিবাদলিপিতে মেহেদী হাসান ও নাসির উদ্দীন উভয়েই দাবি করেন, সংবাদ প্রতিবেদনে প্রকাশিত বক্তব্যগুলো কোনো নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের ফল নয়; বরং ব্যক্তিগত আক্রোশ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের অংশ। তাদের দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতা জীবন ও সামাজিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এসব অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে বলে দাবি করেন তারা।
তারা বলেন, “আমরা সবসময় বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করি। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কাজ করাই আমাদের লক্ষ্য। কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী মহল ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।”
প্রতিবাদলিপিতে প্রকাশিত সংবাদের তথ্য-উপাত্ত পুনঃযাচাই করার আহ্বান জানিয়ে গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ ইব্রাহিম-এর কাছে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানান মেহেদী হাসান ও নাসির উদ্দীন। তারা বলেন, বিষয়টি নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে এবং সাংবাদিক সমাজের মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাই প্রকৃত সত্য উদঘাটনের স্বার্থে উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে একটি গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। তারা আরও বলেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন ও সাংগঠনিক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, আর অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রমাণিত হলে অপপ্রচার ও মানহানির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।
এদিকে স্থানীয় সাংবাদিক মহল ও সচেতন নাগরিকদের একটি অংশের মতে, অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের কারণে বিষয়টি জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তাই কোনো পক্ষকে আগাম দোষী বা নির্দোষ ঘোষণা না করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হলে একদিকে যেমন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে জনমনে থাকা বিভ্রান্তি দূর হবে, অন্যদিকে সাংবাদিকতার মর্যাদা, পেশাগত নৈতিকতা এবং জনআস্থাও অক্ষুণ্ণ থাকবে। বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে গৌরনদী প্রেসক্লাব ও সংশ্লিষ্ট মহল কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেদিকেই নজর রয়েছে স্থানীয়দের।