অনলাইন ডেস্কঃ
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার জোনাইল ইউনিয়নের চৌমুহন গ্রামকে ঘিরে সম্প্রতি একটি চাঞ্চল্যকর বিষয় সামনে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, এই ছোট্ট গ্রামেই গড়ে উঠেছে কথিত ‘জিনের বাদশাদের’ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তাদের ভাষ্যমতে, গ্রামটিতে অন্তত ৩৭ জন কথিত জিনের বাদশা এবং প্রায় ১৮৫ জন সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন। পাশাপাশি পাশের কুশমাইল ও সংগ্রামপুর গ্রামেও আরও কয়েকজন একই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এসব ব্যক্তি নিজেদের জিনের বাদশা, তান্ত্রিক বা কবিরাজ পরিচয়ে ইউটিউব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অলৌকিক ক্ষমতার প্রচার চালান। তারা দাবি করেন, জিনের সাহায্যে কঠিন রোগ নিরাময়, পারিবারিক কলহ দূরীকরণ, ব্যবসায় সফলতা অর্জন কিংবা বিভিন্ন ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান সম্ভব। এই প্রচারণার মাধ্যমে তারা দেশ-বিদেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে বসবাসরত প্রবাসীদের লক্ষ্যবস্তু বানান বলে অভিযোগ উঠেছে।
সৌদি আরবপ্রবাসী বগুড়ার বাসিন্দা দয়াল খান জানান, তার কন্যাসন্তান দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েও সন্তোষজনক ফল পাননি। একপর্যায়ে ইউটিউবের মাধ্যমে চৌমুহন গ্রামের কথিত জিনের বাদশা ইমরানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। মেয়েকে সুস্থ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন সময়ে তার কাছ থেকে প্রায় এক লাখ বিশ হাজার টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন চিকিৎসার নামে নানা কার্যক্রম চললেও শিশুটির অবস্থার উন্নতি হয়নি, বরং আরও অবনতি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। পরবর্তীতে টাকা ফেরত চাইলে তাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন মৌলভীবাজারের বাসিন্দা বদরুল ইসলাম। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এক নারী আত্মীয় ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যার সমাধানের আশায় ইউটিউবে ভিডিও দেখে কয়েকজন কথিত জিনের বাদশার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময়ে তার কাছ থেকে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিলে তাকে জিন বা পরী দিয়ে ক্ষতি করার ভয় দেখানো হয়। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ ও বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেও তিনি কোনো কার্যকর প্রতিকার পাননি বলে জানান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই কথিত জিনের বাদশাদের অনেকেই একসময় সাধারণ শ্রমিক বা কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে তাদের অনেকেরই একাধিক বহুতল ভবন, গাড়ি এবং বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। মানুষের বিশ্বাস ও দূর্বলতাকে পুঁজি করে তারা একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক বলয় তৈরি করেছেন বলে স্থানীয়দের ধারণা।
গ্রামবাসীর আরও অভিযোগ, গভীর রাত পর্যন্ত জিন-ভূত সংক্রান্ত ভিডিও ধারণ ও অনলাইন প্রচারণা চালানো হয়। গ্রামের বিভিন্ন স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে। তাদের মতে, বছরের পর বছর ধরে শত শত প্রবাসী এই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
এ বিষয়ে বড়াইগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস ছালাম বলেন, সম্প্রতি বিষয়টি জানার পর পুলিশ চৌমুহন গ্রামে ভিডিও ধারণের কয়েকটি স্পট ভেঙে দিয়েছে। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পলাতক থাকায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তিনি আরও জানান, প্রতারিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।