ড. ইউসুফ আল কারজাভি (রহ.)
ইসলামে শর্ত সাপেক্ষে সংগীত চর্চার অবকাশ থাকলেও ইসলাম গান-বাদ্যে মত্ত হতে নিরুত্সাহিত করেছে। কেননা বেশির ভাগ সময় এই মত্ততা মানুষকে আল্লাহ-বিমুখ করে এবং জীবন, সমাজ ও বাস্তবতা থেকেও বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
গানের প্রকৃতি
বস্তুত গান-বাদ্যে মত্ত মানুষের জীবন ও বিশ্বাস বিশ্লেষণ করলে যে বক্রতা ও সীমালঙ্ঘন পাওয়া যায় তাই গান-বাদ্য হারাম হওয়ার মূল কারণ। এসব কারণেই আলেমরা গান-বাদ্যের ব্যাপারে কঠোর মনোভাব পোষণ করে থাকেন। এই বক্রতা ও সীমালঙ্ঘনের দুটি রূপ রয়েছে। তা হলো-
১. অশ্লীলতার রূপ : প্রথম রূপটি হলো গানের অশ্লীলতা ও নৈতিক স্খলনের উপকরণগুলো। এক শ্রেণীর মানুষ এই জাতীয় গানে আসক্ত এবং তা তাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এই শ্রেণীর মানুষ ভোগ-বিলাসে মত্ত। তারা দ্বিনদারি ও ইবাদত-বন্দেগি সম্পূর্ণরূপে পরিহার করেছে। প্রবৃত্তিই তাদের উপাস্য এবং তারা কুপ্রবৃত্তিরই অনুগত। এই ধরনের গানের সঙ্গে পাপাচার, নেশা, মাদক, মিথ্যা ও প্রতারণা মিলেমিশে একাকার। সুন্দরী নারী গায়িকারা মানুষের বিবেক বুদ্ধি নিয়ে খেল-তামাশায় লপ্তি।
মুসলিম সমাজে এমন অশ্লীল গানের প্রসার আব্বাসি যুগে এক সময় বিস্তার লাভ করেছিল। তখন গান শুনতে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ জলসায় যেতে হতো এবং সেখানে আল্লাহর অবাধ্যতার যাবতীয় আয়োজন থাকত। বর্তমান যুগেও সংগীতাঙ্গনের পরিবেশ এমনই রয়েছে। ঈমান ও আমল বিধ্বংসী মহামারি এখনো চলমান।
২. সুফিবাদী গান : দ্বিতীয় রূপটি হলো ধর্মীয় রূপ। যা মুসলিম সমাজে সুফিবাদী গান বা সংগীত হিসেবে পরিচিত। সুফিরা এই ধরনের গানকে আল্লাহর প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসার তৈরি মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে তারা তাদের অন্তরকে আল্লাহর পথে চালিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত করার প্রয়াস পেয়েছে। যেমন উট চালকরা পথ চলার সময় হুদ নামক গান গেয়ে থাকে। যা গান চালকের মনকে প্রশান্ত করে এবং উটকে দীর্ঘ পথ চলতে অনুপ্রাণিত করে। এসব সুললিত ছন্দবদ্ধ গান উটগুলোতে চঞ্চল ও দ্রুতগামী করে তোলে। তখন ভারী বোঝাও তাদের কাছে হালকা এবং দীর্ঘ দুর্গম পথও সংক্ষিপ্ত হলে মনে হয়। তাই সুফিরা এই ধরনের ভক্তিমূলক গান শোনাকে ইবাদত তথা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম বলে থাকেন। কেউ কেউ বলেন, এসব গান মানুষকে আল্লাহর ইবাদত ও নৈকট্য লাভের প্রচেষ্টায় মনোযোগী করে।
সুফিবাদী গানের বিধান
পূর্ববর্তী আলেমদের ভেতর শায়খুল ইসলাম ইবনে কাইমিয়া ও আল্লামা ইবনু কায়্যিম জাওজি (রহ.) এই ধরনের গানের তীব্র নিন্দ করেছেন। তারা এমন গানকে বৈধ মনে করতেন না। তাদের যুক্তি হলো যে মাধ্যম আল্লাহর রাসুল (সা.) ও তার সাহাবিরা গ্রহণ করেনি তা ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হয় কি করে? এছাড়াও এগুলো শরিয়তের সীমালঙ্ঘন ও দ্বীনের মৌলিক বিধি-বিধানের প্রতি উদাসীনতা বাড়ায়।
বৈধ গান যেসব কারণে অবৈধ হয়
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজালি (রহ.) সুফিবাদী গানের ব্যাপারে ভারসাম্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মৌলিকভাবে এসব গান বৈধ। তবে আনুষঙ্গিক কিছু বিষয়ের কারণে তা হারাম হতে পারে। বিষয়গুলো হচ্ছে-
১. গায়কের কারণে: গায়ক বা পরিবেশক যদি নারী হয়, তবে তা শোনা হারাম। কেননা এতে পর্দার লঙ্ঘন হয়। নারীর গান শুনলে গায়িকার প্রতি আসক্ত হওয়ার ভয় থাকে।
২. বাদ্যযন্ত্রের কারণে: যে কোনো গানে বাদ্যযন্ত্র যুক্ত হলে তা হারাম হয়ে যায়। কেননা ইসলাম বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার অনুমোদন করে না।
৩. বিষয় বস্তুর কারণে: গানের বিষয়বস্তু অশ্লীল, অশালীন ও আপত্তিকর হলে তা গান হারাম হওয়ার কারণ হতে পারে। যেমন আল্লাহ, তার রাসুল ও সাহাবিদের শানের পরিপন্থী বক্তব্য, কোরআন-হাদিস ও শরিয়তের বিধান অস্বীকার ইত্যাদি।
৪. শ্রোতার কারণে: গান শুনে যদি শ্রোতার ইবাদত ও দ্বিনদারিতে শৈথল্য আসে, তার যৌন ও কামাসক্তি তীব্র হয় এবং সে মাদক ও নারী সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তবে তার এই নৈতিক স্খলনের কারণে তার জন্য গান শোনা হারাম হয়ে যেতে পারে।
৫. মন্দ প্রভাবের কারণে: শ্রোতা যদি সাধারণ মানুষ হয় যার অন্তরে আল্লাহর প্রেম বাসা বাঁধেনি, ফলে গানই তার অন্তরকে আবিষ্ট করে নেয়, এমন অবস্থায় ব্যক্তির অন্তরে গান উত্তেজনা সৃষ্টি না করলেও তার জন্য গান শোনা নিষিদ্ধ হবে।
লেখকের নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে আলেমা হাবিবা আক্তারের ভাষান্তর