তালাত মাহামুদ
বিশেষ প্রতিনিধি, নরসিংদী
মানুষের হৃদয়ে প্রেমের আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন। অপরূপ সৌন্দর্যের সাক্ষাৎ পাওয়ার বাসনা প্রায় সকল মানুষের মধ্যেই বিরাজ করে। সাধারণত মানুষ যাকে ভালোবাসে, তাকে পাওয়ার স্বপ্ন দেখে; মিলনকে মনে করে প্রেমের পরিণতি। কিন্তু প্রেমের আরেকটি গভীরতর স্তর আছে, যেখানে প্রাপ্তির চেয়ে না-পাওয়ার মধ্যেই সৌন্দর্য নিহিত থাকে। সেই প্রেম জাগতিক নয়, বরং আধ্যাত্মিক।
জাগতিক প্রেমে মানুষ প্রিয়জনকে নিজের করে পেতে চায়। সমাজের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, যাকে ভালোবাসি তাকে বিয়ে করতেই হবে, তাহলেই প্রেম পূর্ণতা পায়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এরপর? প্রাপ্তির পর কি অনুসন্ধান বেঁচে থাকে? নাকি প্রাপ্তির মধ্যেই প্রেমের রহস্যের অবসান ঘটে?
অনেক সময় দেখা যায়, অর্জনের পর আকাঙ্ক্ষার তীব্রতা কমে আসে। কিন্তু আধ্যাত্মিক প্রেমে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে চাওয়াটাই সৌভাগ্য, আকুলতাটাই প্রাপ্তি। প্রেমিক জানেন, মিলন যদি চূড়ান্ত হয়, তবে অনুসন্ধানের পথ শেষ হয়ে যেতে পারে। অথচ বিরহ সেই অনুসন্ধানকে বাঁচিয়ে রাখে, প্রেমকে জীবন্ত রাখে।
প্রেমের এই রূপে বিরহ কোনো দুঃখ নয়; বরং এটি এক ধরনের আনন্দময় সাধনা। মিলন একটি মুহূর্তের ঘটনা হতে পারে, কিন্তু বিরহ প্রতিদিনের। তাই আধ্যাত্মিক সাধকরা অনেক সময় প্রাপ্তির চেয়ে তৃষ্ণাকে অধিক মূল্য দেন।
মানুষ সাধারণত প্রভুকে পাওয়ার জন্য ইবাদত করে। কিন্তু প্রেমিক এমন এক অবস্থায় পৌঁছায়, যেখানে প্রভুর সন্ধানে থাকার আনন্দই তার কাছে সবচেয়ে মধুর হয়ে ওঠে। সে জানে, খোঁজার মধ্যেই রয়েছে জীবন, আকুলতা ও প্রেমের সজীবতা।
ভক্তিময় প্রেমের এক উজ্জ্বল উদাহরণ মীরা। কথিত আছে, তিনি কৃষ্ণের সন্ধানে বহু দূর পথ অতিক্রম করেছিলেন। প্রত্যাশা ছিল, এবার হয়তো দর্শন মিলবে। কিন্তু ফিরে এলেন শূন্য হাতে। আশ্চর্যের বিষয়, তিনি দুঃখ না করে আনন্দে নাচতে লাগলেন।
যখন কেউ জিজ্ঞাসা করল, “তুমি তো কৃষ্ণকে পেলে না, তবে আনন্দ করছ কেন?”
মীরা উত্তর দিয়েছিলেন—
“যদি পেয়ে যেতাম, তবে খোঁজ শেষ হয়ে যেত। এখনো পাইনি বলেই খোঁজ বেঁচে আছে, প্রেম বেঁচে আছে, আকুলতা বেঁচে আছে।”
এই উপলব্ধি আমাদের শেখায় যে, সব প্রাপ্তিই প্রকৃত প্রাপ্তি নয়। কিছু অপূর্ণতা মানুষের জীবনকে আরও গভীর ও অর্থবহ করে তোলে।
সুফি সাধক রুমির একটি বিখ্যাত বাণী রয়েছে—“সব ব্যথা দূর করতে নেই; ব্যথার নিরাময় ব্যথার মধ্যেই নিহিত।” এই কথার মধ্যেই প্রেমের গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। কারণ যে হৃদয় ভালোবাসতে জানে, সে জানে ব্যথাও এক ধরনের আশীর্বাদ।
একজন শিষ্য দীর্ঘদিন সাধনার পর গুরুকে বললেন, “এত বছর খুঁজলাম, কিছুই পেলাম না।”
গুরু উত্তর দিলেন, “তুমি যা খুঁজছ তা পাওনি, কিন্তু দেখো, সেই খোঁজ তোমাকে কী বানিয়েছে।”
শিষ্য তখন উপলব্ধি করলেন, গন্তব্য নয়, যাত্রাটাই ছিল আসল প্রাপ্তি।
প্রসিদ্ধ সাধিকা রাবেয়া বসরীকেও একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “আপনি কি তাঁকে পেয়েছেন?”
তিনি বলেছিলেন—
“আমি তাঁকে পুরোপুরি পেয়ে গেলে খোঁজা বন্ধ হয়ে যেত। আমি তো সেই খোঁজাতেই বেঁচে আছি।”
এই উপলব্ধি আমাদের শেখায়, জীবনের সবকিছু পেয়ে যাওয়াই জীবন নয়। কিছু স্বপ্ন অপূর্ণ থাকে বলেই মানুষ বেঁচে থাকে, কিছু আকাঙ্ক্ষা অসম্পূর্ণ থাকে বলেই হৃদয়ে আলো জ্বলে।
প্রেমে আত্মসমর্পণ করতে হয়, ভক্তি রাখতে হয়, কখনও কখনও নিজেকে ছোট করতেও হয়। প্রেম মানুষকে বিনয়ী করে, অহংকার ভেঙে দেয়। কিন্তু যখন কেউ প্রেমের ভেতরেও জয়ী হতে চায়, নিজেকে বড় প্রমাণ করতে চায়, তখন প্রেমের পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যায়।
প্রকৃত প্রেম অধিকারের নয়, উৎসর্গের। সেখানে জয়-পরাজয় নেই, আছে কেবল নিবেদন। আর যে মানুষ ভালোবেসেও প্রিয়জনকে সুখী করতে পারে না, সে অন্তত এই সান্ত্বনা পেতে পারে যে, ভালোবাসার ক্ষমতাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
তাই বলা যায়, সব পাওয়াই পাওয়া নয়; কিছু না-পাওয়াও এক ধরনের প্রাপ্তি। কিছু বিরহ, কিছু আকুলতা এবং কিছু অপূর্ণতাই মানুষকে তার অন্তর্গত সত্যের দিকে নিয়ে যায়। প্রেমের চূড়ান্ত সৌন্দর্য হয়তো প্রাপ্তিতে নয়, বরং সেই অনন্ত খোঁজের মধ্যেই নিহিত।