মো:আ:কুদ্দুস হোসাইন
বিশেষ প্রতিনিধি রংপুর
বৃষ্টির পানি নামতে শুরু করলেই রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে দেখা দেয় গবাদিপশুর রোগের শঙ্কা। এর মধ্যে অ্যানথ্রাক্স অন্যতম উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে বৃষ্টির পানি সরে যাওয়ার পর চারণভূমি ও মাটিতে থাকা জীবাণুর সংস্পর্শে গবাদিপশু আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। আক্রান্ত পশু জবাই, মৃত পশুর সঠিকভাবে নিষ্পত্তি না করা এবং অপরিকল্পিতভাবে মাংস বিক্রির মাধ্যমে মানুষের মধ্যেও সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে।
২০২৫ সালে রংপুরে অ্যানথ্রাক্সের বিস্তার নতুন করে জনস্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সামনে নিয়ে আসে। সে সময় পীরগাছা, কাউনিয়া ও মিঠাপুকুরে অ্যানথ্রাক্সের রোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়। রংপুর জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রথম আলো জানায়, পীরগাছায় ৩৮ জন, কাউনিয়ায় ১৮, মিঠাপুকুরে ১২, গঙ্গাচড়ায় ৭ এবং পীরগঞ্জে একজনসহ মোট ৭৮ জন সন্দেহভাজন অ্যানথ্রাক্স রোগী শনাক্ত হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ২৪ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল।
পীরগাছায় অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে তিন জনের মৃত্যুর খবরও প্রকাশিত হয়। একই সময়ে উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে অর্ধশত মানুষের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।বৃষ্টি পর কেন বাড়ে ঝুঁকি
অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু পরিবেশে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। কোনো আক্রান্ত পশু মারা যাওয়ার পর তার মৃতদেহ সঠিক নিয়মে নিষ্পত্তি না করা হলে পরিবেশে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। পরবর্তীতে পশু ওই এলাকার ঘাস বা মাটির সংস্পর্শে এলে সংক্রমিত হতে পারে।
আক্রান্ত পশুর চামড়া, রক্ত, মাংস বা অন্যান্য টিস্যুর সংস্পর্শ থেকেও মানুষের সংক্রমণ ঘটতে পারে। ফলে গবাদিপশুর রোগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষাও সরাসরি জড়িত।
২০২৫ সালের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে রংপুরের পীরগাছা, কাউনিয়া ও মিঠাপুকুরে সংক্রমণের পাশাপাশি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জসহ আশপাশের এলাকাতেও অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গের খবর উঠে আসে।
অ্যানথ্রাক্সের ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু টিকাদান বা চিকিৎসা কার্যক্রম যথেষ্ট নয়; গবাদিপশু জবাই ও মাংস বিক্রির ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মিঠাপুকুর উপজেলার বিভিন্ন বাজারে এখনো নির্দিষ্ট ও স্বাস্থ্যসম্মত কসাইখানার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বলদিপুকুর, জায়গীর ও বৈরাগীগঞ্জ বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের পাশে বা আশপাশে গরু জবাই করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব স্থানে পশুর রক্ত, বর্জ্য ও অন্যান্য অবশিষ্টাংশ যথাযথভাবে অপসারণ করা না হলে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে জায়গীরের মতো বড় বাজারে একটি নির্দিষ্ট ও স্বাস্থ্যসম্মত কসাইখানা না থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গবাদিপশু জবাই করা হলেও নিয়মিত তদারকি দেখা যায় না।
স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়া পশু জবাইয়ের অভিযোগ,মিঠাপুকুর উপজেলা
প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা মো:আসাদুজ্জামান আশাদ বলেন, গবাদিপশু জবাইয়ের আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এবং অসুস্থ পশু জবাই না করার বিষয়ে নিয়ম রয়েছে। মাংস বাজারজাত করার ক্ষেত্রেও পশুর স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে মাঠপর্যায়ে এ নিয়ম কতটা কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে, তা নিয়ে তিনি পর্যবেক্ষণ করছেন। জনসচেতনতা বারাতে তিনি নিয়মিত উঠান বৈঠক ও প্রচারণা চালাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট একজন পশু চিকিৎসক জানান, জবাইয়ের আগে পশু পরীক্ষা করার নিয়ম থাকলেও ২০২৬ সালের শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত তা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। অসাধু ব্যবসায়ী বা কসাই অসুস্থ পশু জবাই করে থাকলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গরু জবাইয়ের আগে অবশ্যই পশু চিকিৎসকের পরামর্শ ও অনুমোদন নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে তিনি জানান, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচারণা ও উঠান বৈঠক করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়া পশু জবাই করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
টিকাদান হচ্ছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ের নজরদারি কতটা?
২০২৫ সালের প্রাদুর্ভাবের সময় রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় গবাদিপশুকে অ্যানথ্রাক্সের টিকা দেওয়ার কার্যক্রম চালানো হয়েছিল। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, পীরগাছার পাশাপাশি কাউনিয়া, মিঠাপুকুরসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকাতেও টিকা কার্যক্রম চালানো হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—টিকা দেওয়ার পাশাপাশি বাজার পর্যায়ে জবাই করা পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মাংস বিক্রির স্থান, মৃত পশুর সঠিক নিষ্পত্তি এবং কসাইদের নিয়মিত তদারকি কতটা হচ্ছে?
কারণ, শুধু প্রাদুর্ভাবের সময় তৎপরতা বাড়িয়ে পরে নজরদারি কমিয়ে দিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নথিতেও সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের জন্য আইনগত কাঠামোর কথা উল্লেখ রয়েছে।
অসুস্থ পশু জবাই বন্ধে প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থা
গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি গরু অনেক পরিবারের বড় সম্পদ। কোনো পশু অসুস্থ হলে কৃষক আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় সেটি দ্রুত বিক্রি বা জবাই করার চেষ্টা করতে পারেন। এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় না নিয়ে শুধু নিষেধাজ্ঞা জারি করলে মাঠপর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
২০২৫ সালের অ্যানথ্রাক্স পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত বিশ্লেষণেও অসুস্থ পশু জবাই, আক্রান্ত মাংসের সংস্পর্শ এবং আর্থিক ক্ষতির বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তাই আক্রান্ত পশুর মালিককে দ্রুত শনাক্ত করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পশুটি পরীক্ষা, চিকিৎসা বা নিরাপদ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য ক্ষতিপূরণ বা সহায়তার ব্যবস্থা করা হলে অসুস্থ পশু গোপনে বিক্রি বা জবাইয়ের প্রবণতা কমানো সম্ভব হতে পারে।
অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে শুধু উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর বা স্বাস্থ্য বিভাগের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। স্থানীয় প্রশাসন, পৌরসভা/ইউনিয়ন পরিষদ, বাজার কমিটি, প্রাণিসম্পদ বিভাগ, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন।
প্রতিটি বড় বাজারে নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসম্মত জবাইখানা স্থাপন, জবাইয়ের আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরীক্ষিত পশুর মাংসের পরিচয় নিশ্চিত করা, জবাইয়ের বর্জ্য নিরাপদে অপসারণ এবং নিয়মিত বাজার পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা জরুরি।
একই সঙ্গে কসাই, মাংস ব্যবসায়ী ও গবাদিপশু পালনকারীদের নিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং উঠান বৈঠক বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিজস্ব কাঠামোতেও ঝুঁকি যোগাযোগ ও কমিউনিটি এনগেজমেন্টকে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে।
রংপুরের ২০২৫ সালের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, অ্যানথ্রাক্সকে শুধু পশুর রোগ হিসেবে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। এটি প্রাণিসম্পদ, কৃষকের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বৃষ্টির পানি নামার পর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গবাদিপশুর টিকাদান, মৃত পশুর নিরাপদ নিষ্পত্তি, অসুস্থ পশু জবাই বন্ধ, বাজারে স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং মাংস বিক্রিতে নজরদারি—এই পাঁচটি বিষয়ে একযোগে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
নইলে প্রতিবছর প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর তৎপরতা বাড়ানো এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে আবার নজরদারি কমে যাওয়ার একই চক্র চলতে থাকবে। রংপুরের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় তাই অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে প্রাদুর্ভাব-পরবর্তী ব্যবস্থা নয়, বরং বছরজুড়ে নিয়মিত নজরদারি ও জনস্বাস্থ্য যোগাযোগ প্রয়োজন।